জরায়ুতে টিউমার কি কি কারণে হয় ও তার চিকিৎসা জেনে রাখুন-সুস্থ থাকুন-Uterine tumor and its treatment

ঋতুচক্র বা মাসিক, জরায়ুর টিউমার-ফাইব্রয়েড রোগের লক্ষণ ও সম্প্রসারের ওপর মেনোপজের প্রভাব
ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড হল ছোট ছোট টিউমার আকৃতির মাংস পিণ্ড যা জরায়ুর দেওয়ালে তৈরি হয়। এই টিউমারগুলো “বিনাইন” প্রকৃতির, অর্থাৎ নন ক্যান্সারাস। যদিও এগুলোর ফলে যন্ত্রণা ও অন্যান্য রোগলক্ষণ দেখা যায়। মহিলাদের শরীরে যত রকমের বিনাইন টিউমার হয়, তার ভেতর ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। বেশিরভাগ মহিলাদের তাদের সন্তান ধারনের উপযুক্ত বয়সের ভেতর এর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে মেনোপজের সময়েই প্রথম ফাইব্রয়েড রোগের লক্ষণ দেখা যায়।

ফাইব্রয়েড এবং হরমোন
ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন ফাইব্রয়েডের ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোনের উৎপাদন কমে যায়, ফলে ফাইব্রয়েড হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। হরমোনের হঠাৎ কমে যাওয়ার আগে থেকে যে ফাইব্রয়েড গুলো আছে, তাদের আকারও ছোট করে দেয়।

ফাইব্রয়েডের রিস্ক ফ্যাক্টর
কিছু কিছু শারীরিক পরিস্থিতির কারণে ফাইব্র‍য়েড হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সেগুলো হল—

হাই ব্লাড প্রেশার
ভিটামিন ডি শরীরে কম থাকা
পরিবারের মহিলাদের ফাইব্রয়েড হয়ে থাকলে (ফ্যামিলি হিস্ট্রি)
ওবেসিটি
কখনো প্রেগন্যান্ট না হয়ে থাকলে
দীর্ঘদিন ধরে প্রচন্ড মানসিক চাপ
ফাইব্রয়েড রোগের লক্ষণ
মেনোপজের আগে ও পরে ফাইব্রয়েডের রোগ লক্ষণ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণ ভাবে মেনোপজের আগে রোগলক্ষণ অনেক বেশি সমস্যা-দায়ক হয়ে থাকে। আবার কখনো কখনো ফাইব্রয়েডের একেবারেই কোনো রোগলক্ষণ থাকে না। মেনোপজের আগে হোক বা পরে, সাধারণ ভাবে যে রোগলক্ষণগুলো দেখা যায়, সেগুলো হল —
মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত
প্রায়ই স্পটিং হওয়া
অতিরিক্ত রক্তপাতের ফলে অ্যানিমিয়া
প্রায়ই মেনস্ট্রুয়াল ক্রাম্পিং এর মতো যন্ত্রণা হওয়া
তলপেট ভারী হয়ে থাকা
পেটে ফোলাভাব ও ব্যাথা
পিঠের নীচের দিকে যন্ত্রণা হওয়া
বারবার মূত্রত্যাগের প্রবণতা
যন্ত্রণাময় সঙ্গম
জ্বর
গা গুলানো
মাথা যন্ত্রণা
মেনোপজের পরে ফাইব্রয়েডের চিকিৎসা
ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করতে গেলে বর্তমানে জন্ম নিরোধক বড়ি (বার্থ কন্ট্রোল পিল) সবথেকে বেশি ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসক সার্জারীর মাধ্যমেও ফাইব্রয়েড অপসারনের কথা বলতে পারেন, যাকে “মায়োমেকটমি” বলা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিসটেরেক্টমি বা সার্জারীর মাধ্যমে সম্পূর্ণ জরায়ু বাদ দেওয়ারও প্রয়োজন পড়তে পারে।

হরমোন থেরাপি
বার্থ কন্ট্রোল পিলের সাহায্যে অতিরিক্ত রক্তপাত ও যন্ত্রণা কে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। যদিও এতে ফাইব্রয়েডের আকার ছোট হয় না বা তারা সেরে যায় না। ফাইব্রয়েড নিয়ন্ত্রণে কম্বিনেশন অথবা শুধুমাত্র প্রোজেস্টিন আছে এমন বার্থ কন্ট্রোল পিল ব্যবহার করা হয়। প্রোজেস্টিন মেনোপজের অন্যান্য সমস্যাকেও কম রাখে এবং হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি কে ভালো ভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। যন্ত্রণা ও অতিরিক্ত রক্তপাত কমানোর জন্য অন্যান্য যে হরমোনাল ট্রিটমেন্ট করা হয়, তা হল প্রোজেস্টিন ইঞ্জেকশন এবং ইন্ট্রাইউটেরাইন ডিভাইস, যাতে প্রোজেস্টিন থাকে।

মায়োমেকটমি
মায়োমেকটমি ফাইব্রয়েড এবং তার অন্যান্য রোগ লক্ষণ যেমন অতিরিক্ত রক্তপাত ইত্যাদিকে বন্ধ করে দেয়। এই সার্জারী তখন করা হয়, যখন রোগী ভবিষ্যতে সন্তান ধারন করতে চান বা অন্য কোনো কারণে তাঁর জরায়ুর প্রয়োজন হতে পারে এমন ক্ষেত্রে। ৮০% থেকে ৯০% মহিলাই মায়োমেকটমির মাধ্যমে রোগলক্ষণ থেকে মুক্তি পায় বা তাদের রোগলক্ষণ কমে যায়। বাদ দেওয়া ফাইব্রয়েডগুলো সার্জারীর পরে আর ফিরে আসে না, তবে আবার নতুন ফাইব্রয়েড তৈরি হতে পারে। এই সার্জারি করা ৩৩% মহিলার পাঁচ বছরের ভেতর আবার সার্জারী করার প্রয়োজন হয়েছে, কারন ইউটেরাসে তাদের নতুন ফাইব্রয়েডের জন্ম হয়েছে। এই সার্জারি তিনটি পদ্ধতির ভেতর যেকোনো একটি ভাবে করা হয়, এবং কোন পদ্ধতিতে হবে, তা নির্ভর করে ফাইব্রয়েডের সংখ্যা, আকার ও অবস্থানের ওপর। এই ক্ষেত্রে জেনারেল অ্যানাস্থেসিয়া করা হয়। মায়োমেকটমি বিভিন্ন ভাবে করা হয় এবং এটা নির্ভর করে ফাইব্র‍য়েডের অবস্থানের ওপর। যদি ফাইব্রয়েড ইউটেরাইন ক্যাভিটির ভেতর হয়, তাহলে সার্জারী হিস্টেরেস্কোপির মাধ্যমে একটি সরু, লম্বা এবং আলো লাগানো টিউবের সাহায্যে করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক তলপেটে কিছুটা চিরে এই সার্জারী করেন।এই ধরনের সার্জারীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ছোট আকৃতির ফাইব্রয়েড থাকলে ল্যাপ্রোস্কোপির মাধ্যমে সার্জারী করা হয়। এতে সুস্থতা অনেক দ্রুত হয়।

হিসটেরেক্টমি
হিসটেরেক্টমিতে জরায়ুর কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ জরায়ু টাই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। রোগীর যদি সংখ্যায় অনেক, আকারে বড় ফাইব্রয়েড থাকে এবং রোগীর যদি ভবিষ্যতে সন্তান ধারনের কোনো পরিকল্পনা না থাকে তাহলে এই সার্জারী করা হয়। সার্জেন কয়েকটি পদ্ধতিতে জরায়ু কে বাদ দিতে পারেনঃ

ল্যাপারোটমি অথবা অ্যাবডোমিনাল হিসটেরেক্টমি
সার্জেন সার্জারীর মাধ্যমে তলপেট কেটে জরায়ু বাদ দিয়ে দেন।

ভ্যাজাইনাল হিসটেরেক্টমি
সার্জেন রোগীর যোনিপথের মাধ্যমে জরায়ু বাদ দেন, তবে অনেক বড় ফাইব্রয়েড এর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে কাজ হয় না।
ল্যাপরোস্কোপিক হিসটেরেক্টমি
এই পদ্ধতিতে সার্জেন কিছু ইনস্ট্রুমেন্টস প্রবেশ করিয়ে জরায়ুকে ছোট ছোট টুকরো তে কেটে বের করে আনেন।

জরায়ুর টিউমারের চিকিৎসায় ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি
সার্জেন রোগীর ডিম্বাশয় এবং সার্ভিক্সকে অক্ষত রাখেন, ফলে রোগী আবার ফিমেল হরমোন তৈরি করতে পারেন। অ্যাবডোমিনাল হিসটেরেক্টমিতে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগে। ল্যাপরোস্কোপি হিসটেরেক্টমি এবং ভ্যাজাইনাল হিসটেরেক্টমিতে সুস্থতা অনেক দ্রুত আসে।

হিসটেরেক্টমি যে যে ক্ষেত্রে নির্ধারণ করা হয়, সেগুলো হল—
যাঁরা মেনোপজের খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন
যাঁদের মেনোপজ হয়ে গেছে
সংখ্যায় অনেক ফাইব্রয়েড আছে
ফাইব্রয়েডের আকৃতি অনেক বড়
ভবিষ্যতে সন্তান ধারনের ইচ্ছা/সম্ভাবনা নেই
অন্যান্য সব থেরাপি করার পরও ফাইব্রয়েড ফিরে এসেছে
অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি
মেনোপজ চলছে বা মেনোপজ পরবর্তী সময়ের মহিলাদের জন্য মিনিমাল ইনভেসিভ (সামান্য কাটা ছেঁড়া) অথবা নন ইনভেসিভ (কোনো কাটা ছেঁড়া নেই) আরও নানা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। সেগুলো হল —

মায়োলাইসিস
ফাইব্রয়েড ও তার সাথে সংযুক্ত রক্তজালিকাকে উত্তাপ বা ইলেকট্রনিক কারেন্টের মাধ্যমে নষ্ট করে দেওয়া হয়।
ফোর্সড আল্ট্রা সাউণ্ড সার্জারী
হাই এনার্জি, হাই ফ্রিকোয়েন্সি সাউণ্ড ওয়েভ পাঠিয়ে ফাইব্রয়েড নষ্ট করে দেওয়া হয়।
এন্ডোমেট্রিয়াল অ্যাবলেশান
উত্তাপ, ইলেকট্রিক কারেন্ট, গরম জল বা অতিরিক্ত ঠান্ডা ব্যবহার করে ইউটেরাইন লাইনিং কেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
ইউটেরাইন আর্টারি এমবোলাইজেশন
এর মাধ্যমে ফাইব্রয়েডে রক্ত সঞ্চালন ও রক্ত পরিবহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সাধারণ ভাবে ফাইব্রয়েড মেনোপজের আগেই হয়ে থাকে, তবে কারও কারও ক্ষেত্রে মেনোপজের সময়েও ফাইব্রয়েড হয়ে থাকে। চিকিৎসক সব থেকে ভালো ভাবে বলতে পারবেন, যে এর সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি কি হবে এবং সার্জারীর প্রয়োজন আছে কিনা, বা কেমন সার্জারীর প্রয়োজন হবে। যেসব ক্ষেত্রে ফাইব্রয়েডের ফলে কোনো রোগলক্ষণ দেখা যায় না, সেসব ক্ষেত্রে কোনো চিকিৎসা না করলেও চলে।

জরায়ুর টিউমার, অন্যান্য-হিস্টেরোস্কপি কি এবং এটি কিভাবে করা হয়?
হিস্টেরোস্কপি কি তা অনেকেই জানেন না।এটি হল এমন একটি পদ্ধতি যেখানে চিকিৎসক খুব ছোট ব্যাসার্ধের একটি যন্ত্রকে জরায়ু তে প্রবেশ করান এবং সেই যন্ত্রের মাথায় একটি আলো ও ক্যামেরা থাকে, যার সাহায্যে চিকিৎসক জরায়ুর ভিতরের অংশটি সম্পূর্ণ দেখতে পান।

বেশকিছু পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে চিকিৎসক এই পদ্ধতির স্মরনাপন্ন হন। পদ্ধতি টি রোগ নির্ণয় বা সার্জারীর আগে করা হয়। যে যে পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে, তা হল—

অন্য কোনো শারীরিক পরীক্ষার ফল নিশ্চিত করার জন্য
ফাইব্রয়েড ও পলিপ বাদ দেওয়ার জন্য
কোনো ল্যাপ্রোস্কোপিক পদ্ধতির সার্জারীর জন্য
জরায়ুতে কোনো সমস্যা আছে কি না তা দেখার জন্য

হিস্টেরোস্কপি কিভাবে করা হয়?
জরায়ুতে কোনো সমস্যা আছে কিনা তা বোঝার জন্য একজন স্পেশালিষ্ট ডাক্তার এই পরীক্ষা টা করেন। অন্যান্য গাইনোকোলজিকাল পরীক্ষা চিকিৎসক যেভাবে করেন এটাও সেই ভাবেই হয়। চিকিৎসক প্রথমে স্পেকুলাম নামক একপ্রকার যন্ত্রের সাহায্যে সার্ভিক্স এর মুখটা প্রসারিত করেন। এরপর চিকিৎসক ভ্যাজাইনাল ওপেনিং এর মাধ্যমে হিস্টেরোস্কোপির যন্ত্রটি প্রবেশ করান। এরপর যন্ত্রটির মাধ্যমে একটি তরল পদার্থ বা কার্বন ডাই-অক্সাইড জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়, সারফেস টা পরিস্কার করার জন্য এবং জরায়ুর অভ্যন্তর টা একটু পরিস্কার করার জন্য। হিস্টেরোস্কোপ যন্ত্রের মাথায় থাকা আলো এবং ক্যামেরার সাহায্যে জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব ভালো ভাবে লক্ষ্য করেন সেখানে কোনো সমস্যা আছে কি না, বা সার্জারীর আগে বা সময়ে ভালোভাবে সমস্যা লক্ষ্য করেন।

যদি হিস্টেরোস্কপি সার্জারীর জন্য করা হয়, তাহলে হিস্টেরোস্কোপ যন্ত্রের মাধ্যমেই জরায়ুর ভেতর সার্জারীর যন্ত্রপাতি প্রবেশ করানো হয়।

এই পদ্ধতিতে সাধারণত কোনো যন্ত্রণা হওয়া উচিত নয়, তবে এই পদ্ধতিটি চলার সময় ক্রাম্পিং বা টান লাগা জাতীয় অস্বস্তি হতে পারে। রোগীকে রিল্যাক্স করার জন্য চিকিৎসক কিছু সিডেটিভ জাতীয় ওষুধ রোগীকে প্রেস্ক্রাইব করেন। অ্যানাস্থেসিয়া কতক্ষনের জন্য প্রয়োজন হবে তা নির্ভর করে কি কারনে হিস্টেরোস্কোপি করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ পদ্ধতিটি পাঁচ মিনিটও লাগতে পারে বা তিরিশ মিনিটও লাগতে পারে। সময় টা নির্ভর করে হিস্টেরোস্কোপি কোন সমস্যার জন্য করা হচ্ছে সেই কারণে।

রোগ নির্ণয় এর জন্য যদি হিস্টেরোস্কোপি ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা সাধারণত চিকিৎসকের চেম্বারেই সাধারণ বা লোকাল অ্যানাস্থেসিয়ার মাধ্যমে পদ্ধতিটি করা হয়। ছোট ছোট পলিপ বাদ দেওয়ার জন্য এইভাবেই পদ্ধতিটি করা হয়। আর হিস্টেরোস্কোপি যদি কোনো বড় সার্জারীর জন্য করা হয় তাহলে তা হাসপাতালে হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রেও চিকিৎসক জেনেরাল বা লোকাল অ্যানাস্থেসিয়া ব্যবহার করে থাকেন, সার্জারী কতটা গভীর সেটার ওপর নির্ভর করে।

হিস্টেরোস্কপি হওয়ার পর সুস্থ হতে কত সময় লাগে?
সুস্থ হতে কতো সময় লাগবে তা নির্ভর করে কি কারণে হিস্টেরোস্কপি করা হচ্ছে। যদিও যেকোনো হিস্টেরোস্কপির পর রোগী যে যে অবস্থার সম্মুখীন হতে পারেন, তা হলো—
ক্রাম্পিং
হাল্কা রক্তপাত একদিনের জন্য
কাঁধে ব্যাথা (যদি কার্বন ডাই-অক্সাইড দেওয়া হয়ে থাকে তাহলে)
হাল্কা বমিভাব
ঘুম ঘুম বা ঝিমুনি ভাব
হিস্টেরোস্কপির অব্যবহিত পরেই খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করা যায়। লোকাল অ্যানাস্থেসিয়া করা হলে, চিকিৎসকের চেম্বার থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেই বেরিয়ে পরা যায়। রিজিওনাল অ্যানাস্থেসিয়া হলে, চিকিৎসক রোগীকে ততক্ষন অপেক্ষা করতে বলেন, যতক্ষন না অ্যানাস্থেসিয়ার লক্ষণগুলো স্বাভাবিক হয়ে আসে। জেনেরাল অ্যানাস্থেসিয়া হলেও কয়েক ঘন্টার মধ্যেই রোগী বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে পারেন। চিকিৎসক তখনই শুধুমাত্র সারা রাত হাসপাতালে থাকার নির্দেশ দেন যদি অ্যানাস্থেসিয়ায় রোগীর আগে থেকে কোনো সমস্যা থাকে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক ব্যাথা কমানোর ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করেন তাড়াতাড়ি সুস্থতার জন্য। যদি সার্জারীর প্রয়োজন হয় তাহলে চিকিৎসক দু-তিন দিনের বিশ্রামের নির্দেশ দেন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আগে। হিস্টেরোস্কোপি যদি শুধুমাত্র রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহারনা করা হয়, তাহলে এক সপ্তাহের জন্য যৌন সংসর্গ থেকে দূরে থাকতে হবে যাতে কোনো সংক্রমণ না হয়।

হিস্টেরোস্কপি করার পর কি কি সমসা হতে পারে?
হিস্টেরোস্কপি একটি অত্যন্ত নিরাপদ পদ্ধতি এবং এর জটিলতা খুবই কম থাকে। তবে সাধারণ ভাবে না হলেও কিছু কিছু অস্বাভবিক জটিলতা দেখতে পাওয়া যায়—

সংক্রমণ
জরায়ুতে ক্ষত তৈরি হওয়া
অতিরিক্ত রক্তপাত
অ্যানাস্থেসিয়া বা জরায়ুর অভ্যন্তরের অংশ পরিস্কার করার জন্য ব্যবহৃত তরলের কারণে অ্যালার্জি
চিকিৎসকের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করতে হবে, যদি এই লক্ষণগুলো দেখতে পাওয়া যায় —

অতিরিক্ত রক্তপাত
জ্বর
কাঁপুনি
যন্ত্রণা
চিকিৎসক বিভিন্ন কারণে হিস্টেরোস্কপি করার নির্দেশ দিতে পারেন। ভবিষ্যতের সুস্থতার জন্য ছোট খাটো সার্জারী বা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। রোগীর মনে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা সরাসরি চিকিৎসককে জিজ্ঞাসা করা উচিত তাহলে চিকিৎসক সমস্ত সন্দেহ দূর করে দেবেন। হিস্টেরোস্কোপির সাধারণত কোনো বড় রকমের সাইড এফেক্ট থাকে না। তবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে সম্পূর্ণরূপে আলোচনা করে নিতে হবে। এই পদ্ধতির শেষে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।


জরায়ুর টিউমার-ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড কি? ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন ও উত্তর

ধরুন আপনি আপনার গাইনিকোলজিস্টের কাছ থেকে রুটিন চেকআপ সেরে এসেছেন এবং তিনি বলেছেন যে সম্ভবত আপনি ইউটেরাইন ফাইব্রয়েডে আক্রান্ত। শুনে হয়ত ভাবতে থাকবেন ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড কি? ক্যান্সার নয় তো! এতে কি সমস্যা হয়? এগুলো কি সার্জারী করা প্রয়োজন? কিভাবে সার্জারী হবে?

প্রথমেই বলি, শান্ত হোন, ফাইব্রয়েড খুবই কমন। প্রায় ২০ –৭০% মহিলাদের সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম বয়সটায় ফাইব্রয়েডের সমস্যা হয়ে থাকে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো তে কোনো সমস্যা হয় না। তার মানে এই নিয় যে ফাইব্রয়েডকে অবহেলা করতে হবে। এর ফলে অতিরিক্ত রক্তপাত ও অন্যান্য ফার্টিলিটি সংক্রান্ত সমস্যা দেখা যায়। এখানে কিছু প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আমরা বুঝে নেবো এই ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড কি? কিভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে এবং কি করলে মহিলারা এর থেকে মুক্তি পেতে পারেন, তাই নিয়ে আমরা আলোচনা করবো।

ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড কি?
অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন থাকে, জরায়ুর টিউমার বা ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড কি ক্যান্সারাস টিউমার? এক কথায় এর উত্তর – না। এটি একপ্রকার নন ক্যান্সারাস গ্রোথ, যা জরায়ুর ভেতর তৈরি হয়। এগুলো খুবই কমন। জরায়ুর দেওয়ালের গায়ের বাইরের দিকে ফাইব্রয়েডকে সাবসেরোসাল ফাইব্রয়েড বলা হয়। জরায়ুর পেশির ভেতর দিকে ফাইব্রয়েড হলে তাকে ইন্ট্রামিউরাল ফাইব্রয়েড বলে এবং জরায়ুর ক্যাভিটির ভেতর যে ফাইব্রয়েড হয়, তাকে সাবমিউকোসাল ফাইব্রয়েড বলে।

ফাইব্রয়েড হওয়ার কারন
ফাইব্রয়েড হওয়ার পিছনে বংশগতির প্রভাব ভীষণ ভাবে থাকে। এখনও পর্যন্ত কোনো জীবন ধারনের পদ্ধতির সমস্যার কথা জানা যায়নি, যা ফাইব্রয়েডের কারন হতে পারে।

ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড এর লক্ষন
কিছু কিছু মহিলার ক্ষেত্রেইউটেরাইন ফাইব্রয়েডের কোনো লক্ষনই থাকে না, এমনকি তাঁরা বুঝতেই পারেন না, যে তাঁদের ফাইব্রয়েড আছে। আবার কিছু কিছু মহিলার গুরুতর রোগলক্ষন থাকে। প্রধান রোগলক্ষন হল মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত। কোনো কোনো মহিলার এতই বেশি রক্তপাত হয় যে তারা অ্যানিমিয়ার শিকার হয়। ইউটেরাইন ক্যাভিটির কাছাকাছি থাকা ফাইব্রয়েডগুলো সাধারণত বেশি রক্তপাত ঘটায়। কিছু মহিলাদের ফাইব্রয়েডের আকার এতটাই বড় হয় যে জরায়ুর আকৃতি স্বাভাবিকের থেকে ১০ গুন বেড়ে যায়। একেই চিকিৎসকরা “বাল্ক সিম্পটম” বলেন। কিছু মহিলাদের যেমন মনে হয় যে তাঁরা প্রেগন্যান্ট। জরায়ুর বাল্ক সাইজের জন্য কোষ্ঠকাঠিন্য বা ঘনঘন মূত্রত্যাগের মতো সমস্যাও দেখা যায়।

অন্যান্য সমস্যারও কি এই রোগলক্ষনগুলো হতে পারে?
এই একই ধরনের রোগলক্ষন আর যে যে সমস্যার জন্য হয়ে থাকে, সেগুলো হল — ইউটেরাইন পলিপ, ডিসফাংশনাল ইউটেরাইন ব্লিডিং এবং হরমোনাল সমস্যার কারণে অতিরিক্ত ব্লিডিং হতে পারে।

কিভাবে ফাইব্রয়েডের সমস্যার রোগ নির্ণয় করা হয়
সাধারণত আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ফাইব্রয়েডের ডায়গনসিস করা হয়। এটাই সবচেয়ে সহজ উপায় জরায়ুকে ভালো ভাবে লক্ষ্য করার এবং এর ফলে ফাইব্রয়েডগুলো খুব সহজেই দেখা যায়। খুব ছোট ছোট ফাইব্রয়েডের ক্ষেত্রে এই আল্ট্রাসাউন্ডই একমাত্র উপায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসক MRI ও করে থাকেন, সমগ্র পেলভিক অঞ্চল টা পরীক্ষা করার জন্য।

কিভাবে ফাইব্রয়েডের চিকিৎসা করা হয়?
চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে ফাইব্রয়েডের আকার ও রোগলক্ষনের ওপর। ইউটেরাইন ক্যাভিটির ভেতর দিকে ফাইব্রয়েড থাকলে ডাক্তার হিস্টেরেস্কোপিক মায়োমেক্টমি করে থাকেন, যেখানে ক্যামেরার সাহায্যে জরায়ুর ভেতরটা দেখা হয়। ওই একই সময়ে চিকিৎসক সার্জারী করে ফাইব্রয়েডকে বাদ দিয়ে দেন, যদি সেটা একদম জরায়ুর ক্যাভিটির একদম ভেতরে থাকে। যদি কোনো মহিলার রোগলক্ষন খুব গুরুতর হয় এবং ফাইব্রয়েডের অবস্থান যদি জরায়ুর পেশির ভেতর বা জরায়ুর বাইরের অংশে হয়, তবে সার্জারী একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে রোবোটিক অ্যাসিস্টেড ল্যাপ্রোস্কোপিক মায়োমেকটমি সবথেকে উপযুক্ত। এর মাধ্যমে পেটে মাত্র চার থেকে পাঁচটি ফুটো করা হয় এবং খুব ছোট ছোট যন্ত্রের মাধ্যমে ফাইব্রয়েডগুলোকে বের করে নিয়ে আসা হয়। এর থেকে সিভিয়ার কেসে বড় করে কেটে মায়োমেক্টমি করা হয়। একে অ্যাবডোমিনাল মায়োমেক্টমি বলা হয়। তলপেটে বড় করে কেটে চিকিৎসক ফাইব্রয়েডগুলো কেটে বের করে দেন। কিছু নন সার্জিক্যাল পদ্ধতিতেও ইউটেরাইন ফাইব্রয়েডকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেগুলোকে আকারে ছোট করে দেওয়া হয় এবং তার গ্রোথ ধীরে করে দেওয়া হয়, যেমন বার্থ কন্ট্রোল পিল। লিউপ্রোলাইড অ্যাসিটেট নামক একপ্রকার ওষুধ আছে, যার মাধ্যমে ফাইব্রয়েডের আকার ছোট করে দেওয়া যায়।

ফাইব্রয়েড কিভাবে ফার্টিলিটি ও প্রেগন্যান্সির ওপর প্রভাব ফেলে
ফাইব্রয়েডের আকার তার অবস্থান এবং তার রোগ লক্ষন এই সবকিছুই ফার্টিলিটি ও প্রেগন্যান্সির ওপর প্রভাব ফেলে। ইউটেরাইন ক্যাভিটির ভেতরের ফাইব্রয়েড এমব্রায়োকে জরায়ুর গায়ে ইমপ্লান্ট হতে বাধা দেয় এবং এর ফলে ফিটাস অর্থাৎ ভ্রূণের গঠন হতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। চার সেন্টিমিটার বা তার থেকে বড় আকারের ফাইব্রয়েড যা জরায়ুর দেওয়ালের ভেতরে বা তার পেশির ভেতর তৈরি হয় সেগুলোও ইমপ্লান্টেশনে বাধা দেয়। জরায়ুর পেশির ভেতর অবস্থিত ফাইব্রয়েড ফ্যালোপিয়ান টিউব কে ব্লক করে দেয়, ফলে ইনফার্টিলিটি হয়ে থাকে।

ছোট ও মাঝারি আকারের ফাইব্রয়েড সাধারণত প্রেগন্যান্সিতে বাধা সৃষ্টি করে না, তবে প্রেগন্যান্সির সময় হরমোনের উৎপাদন বেড়ে যায় এবং রক্তসঞ্চালন বেড়ে যাওয়ার কারণে ফাইব্রয়েডগুলির আকার বৃদ্ধি পায়। আকারে বড় ও সংখ্যায় অনেক ফাইব্রয়েড থাকলে প্রেগন্যান্সি ও ডেলিভারিতে যে যে সমস্যা দেখা যায়, সেগুলো হল —

সিজারিয়ান সেকশন — যেসব মহিলাদের ফাইব্রয়েড থাকে তাদের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান সেকশন করার সম্ভাবনা ছয়গুন বেড়ে যায়।
ব্রিচ প্রেসেন্টেশন — বাচ্চার মাথা নীচের দিকে থাকার পরিবর্তে পা নীচের দিকে ও মাথা ওপরের দিকে থাকে।
প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন — বাচ্চা ডেলিভারি হওয়ার আগেই জরায়ুর দেওয়াল থেকে প্লাসেন্টা ভেঙে যায়। এর ফলে বাচ্চা তখন অক্সিজেন পায় না।
প্রিটার্ম ডেলিভারি — বাচ্চার জন্ম সঠিক সময়ের আগে অর্থাৎ প্রেগন্যান্সির ৩৭ সপ্তাহের আগেই হয়ে যায়।

ফাইব্রয়েড থাকলে সন্তান ধারন সম্ভব কি না
বেশিরভাগ সময়েই ফাইব্রয়েড প্রেগন্যান্ট হওয়ার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে না। কিন্তু ফাইব্রয়েডের পরিমাণ যদি অনেক থাকে এবং সেগুলো সাবমিউকোসাল হয়, তাহলে তা ফার্টিলিটির ওপর প্রভাব ফেলে। ফাইব্রয়েড ওভ্যুলেশনে কোনো সমস্যা করে না, কিন্তু সাবমিউকোসাল ফাইব্রয়েড কন্সেপশন ও প্রেগন্যান্সি ক্যারি করতে সমস্যা তৈরি করে। এই ধরনের ফাইব্রয়েড ইনফার্টিলিটি বা প্রেগন্যান্সি লসের জন্যও দায়ী হয়। যদি আপনি প্রেগন্যান্ট হন বা কনসিভ করতে চাইছেন, তাহলে ফাইব্রয়েডেএ নিয়মিত চিকিৎসা ও তার খেয়াল রাখা খুবই জরুরি।

ফাইব্রয়েড কি ক্যান্সারে পরিনত হতে পারে?
ফাইব্রয়েড অধিকাংশ সময়েই বিনাইন অর্থাৎ এর থেকে ক্যান্সার হয় না। খুব রেয়ার কেসে (হাজার জনে এক জনেরও কম) ক্যান্সারাস ফাইব্রয়েড হয়ে থাকে। একে লেইওমায়োসারকোমা বলা হয়। যার ফাইব্রয়েড রয়েছে, তার সেই ফসিব্রয়েড থেকে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফাইব্রয়েড থাকলে তা থেকে ক্যান্সারাস ফাইব্রয়েড হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় না বা ইউটেরাসে অন্য কোনো ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয় না।

চিকিৎসার পরও কি ফাইব্রয়েড ফেরত আসতে পারে?
চিকিৎসার মাধ্যমে ফাইব্রয়েডের অবস্থা ও তার রোগলক্ষনের উপশম হয় ঠিকই, তবে একমাত্র হিসটেরেক্টমি ছাড়া অন্য সব চিকিৎসা পদ্ধতিতেই ফাইব্রয়েড ফিরে আসতে বা নতুন করে হতে পারে। হিসটেরেক্টমিতে চিকিৎসক সম্পূর্ণ জরায়ুটাই বাদ দিয়ে দেন।

কি ধরনের খাদ্য বাদ দিলে ফাইব্রয়েড হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়?
ফাইব্রয়েডের ওপর খাদ্যের প্রভাব নিয়ে চিকিৎসকেরা এখনো গবেষণা করে যাচ্ছেন, তবে দেখা গেছে যে রেড মিট বেশি পরিমানে খেলে ফাইব্রয়েড হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

জরায়ুর টিউমার, নারী স্বাস্থ্য-ফাইব্রয়েড টিউমার বা জরায়ুর টিউমার এর চিকিৎসা: যা যা আমাদের জানা উচিত

চিকিৎসকের কাছ থেকে টিউমার শব্দটি শুনলে ভয় হয় তাহলে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তবে বিষয় টা যখন ফাইব্রয়েড টিউমার, বিশেষজ্ঞ রা বলছেন, তখন সেটা অতটাও চিন্তার বিষয় নয়। এই টিউমার কখনই ম্যালিগন্যান্ট নয়, অর্থাৎ ক্যান্সারাস নয় এবং এর অনেক রকমের চিকিৎসার পদ্ধতি আছে, আবার কখনো কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন না করলেও চলে। ফাইব্রয়েড টিউমার হল মাংস পেশির কোশ দিয়ে তৈরি একরকম মাংসল পদার্থ যা জরায়ুর অভ্যন্তরে গড়ে ওঠে। যদিও সমস্ত ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড একই, তবে তাদের অবস্থানের জায়গা অনুসারে তাদের কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়—
জরায়ুর লাইনিং এর একেবারে নীচেই সাবমিউকোসাল ফাইব্র‍য়েড এর উপ্সথিতি থাকে।
ইন্ট্রামিউরাল ফাইব্রয়েড জরায়ুর দেওয়ালের মাংস পেশির মাঝখানে অবস্থান করে।
সাবসেরল ফাইব্রয়েড জরায়ুর দেওয়াল থেকে শুরু করে পেলভিক ক্যাভিটির অভ্যন্তর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
ফাইব্রয়েড সাধারণ ভাবে ৩০ থেকে ৪০ বছরের মহিলাদের ভেতর সবথেকে বেশি দেখা যায়। পরিবারে মা বা দিদির ফাইব্রয়েড থাকলে ফাইব্রয়েডের সমস্যার সম্ভাবনা অনেক গুনে বেড়ে যায়।

কিছু কিছু মহিলার ক্ষেত্রে ফাইব্রয়েড আলাদা করে কোনো রোগলক্ষনই তৈরি করে না এবং চিকিৎসকদের মত অনুযায়ী সবচেয়ে কমন রোগলক্ষনগুলি হল মাসিকের সময় অতিরিক্ত দীর্ঘদিন ধরে রক্তপাত। ফাইব্রয়েডের ফলে পেটে বা পেলভিক অঞ্চলে ব্যথা, ফোলাভাব এবং ঘন ঘন মূত্রত্যাগের সমস্যা তৈরি হয়। চিকিৎসকরা বলেন ফাইব্রয়েডের রোগলক্ষন, ফাইব্রয়েডের অবস্থান, তাদের সংখ্যা, আকৃতি, রোগীর বয়স, সন্তান ধারনের ক্ষমতা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা পদ্ধতি কি হবে এবং তা কতদিন ধরে চলবে।

ফাইব্রয়েড টিউমার বা জরায়ুর টিউমার এর চিকিৎসায় যে বিষয়গুলি আপনার জানা একান্ত প্রয়োজন
অল্প কিছু বছর আগেও চিকিৎসকরা ফাইব্রয়েড টিউমার বা জরায়ুর টিউমার এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে হিসটেরেকটমিকেই বেছে নিতেন। কিন্তু বর্তমানে আরও নানা প্রকারের চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি হয়ে গেছে, যাতে অধিকাংশ সময়ে হিসটেরেক্টমি করার প্রয়োজনই পড়ে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফাইব্রয়েড আক্রান্ত মহিলারা মনে করেন, যে এর চিকিৎসার জন্য হিসটেরেক্টমিই একমাত্র উপায় – কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।

এছাড়া চিকিৎসক এও বলছেন, যে সব হিস্টেরেক্টমির পদ্ধতিও একতকম নয়, তাই ভীত বা হতাশ না হয়ে হিসটেরেক্টমির অন্যান্য পদ্ধতিগুলি সম্পর্কেও জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

হিসটেরেক্টমির একদম নতুন প্রকার, যাকে সুপ্রা সারভাইকাল হিসটেরেক্টমি বলা হয়, সেখানে কেবলমাত্র ইউটেরাইন ক্যাভিটির যে অংশটাতে ফাইব্রয়েড আছে, সেই অংশটুকুই বাদ দেওয়া হয়। টিউব, ওভারি, সার্ভিক্স, ভ্যাজাইনা বা ব্লাডার এবং পেলভিসের অন্য সমস্ত মাংস পেশি অক্ষত থাকে। এরফলে ট্রাডিশনাল পদ্ধতির হিসটেরেক্টমিতে যে সমস্যাগুলো হয়, যেমন – ব্লাডার বা সেক্সুয়াল ডিসফাংশন এবং তৎক্ষনাৎ মেনোপজ হওয়া, ইত্যাদি সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হতে হয় না। অপারেশনের পরবর্তী সুস্থতাও খুব তাড়াতাড়ি হয়। দুদিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়া যায় এবং দু’সপ্তাহের ভেতর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা যায়। এটা ফাইব্রয়েডের একটা স্থায়ী সমাধানও বটে।

অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি

মায়োমেক্টমি ফাইব্রয়েড সার্জারী: জরায়ু ও অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কে সম্পূর্ণ অক্ষত রেখে শুধুমাত্র ফাইব্রয়েডগুলো বাদ দিয়ে দেওয়া হয়।

পদ্ধতি: যে তিনটে প্রধান পদ্ধতিতে এই অপারেশন করা হয়, সেগুলো হল—

ট্রাডিশনাল পদ্ধতিতে পেট কেটে
পিন হোল সাইজের ছিদ্র করে ল্যাপরোস্কোপির মাধ্যমে
ফাইব্রয়েডের অবস্থান অনুসারে হিস্টেরেস্কোপি, যা ভ্যাজাইনার মাধ্যমে হয়ে থাকে
ফাইব্রয়েডকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয় এবং অনেক বছর পর্যন্ত এর থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কখনো কখনো অনেক দিন পরে আবার ফিরে আসতে পারে ফাইব্রয়েডের সমস্যা।
যেসব মহিলাদের ফাইব্রয়েড আছে, তার থেকে মুক্তি পেতে চান এবং ভবিষ্যতে সন্তান ধারনের ক্ষমতা ধরে রাখতে চান, তাদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি আদর্শ। হিস্টেরেস্কোপি তাদের জন্য সবথেকে বেশি প্রয়োজন, যাদের রক্তপাত ও ফার্টিলিটি সংক্রান্ত সমস্যা আছে এবং ফাইব্রয়েডের কারণে বারংবার যাদের গর্ভপাত হচ্ছে। মায়োমেকটমির পর গর্ভধারণ করতে গেলে বেশিরভাগ মহিলাদেরই IVF এর সাহায্য নিতে হয়, তবে জরায়ু যথেষ্ট সুস্থ ও শক্তিশালী থাকে যাতে রোগী একটা সুস্থ প্রেগন্যান্সি ক্যারি করতে পারে।

ইউটেরাইন আর্টারি এম্বোলাইজেশন: এটি একটি রেডিওলজিক্যাল পদ্ধতি, যাতে ফাইব্রয়েডে রক্ত সঞ্চালন আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায় এবং তার ফলে একসময় ফাইব্রয়েডগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।

এটি একটি মিনিমাল ইনভেসিভ পদ্ধতি। ইউটেরাইন আর্টারির ভেতর একটি ক্যাথিটার প্রবেশ করানো হয়, যার মাধ্যমে ছোট ছোট বস্তু ইঞ্জেক্ট করে ফাইব্রয়েডে রক্ত পরিবহন করা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফাইব্রয়েডে রক্ত সংবহন বন্ধ হয়ে গেলে ফাইব্রয়েড আস্তে আস্তে শুকিয়ে, ছোট হয়ে গিয়ে একসময় মারা যায়। যেসব মহিলারা সন্তানের জন্ম দিয়ে দিয়েছেন তাদের জন্য এটি একটি সঠিক পদ্ধতি।
চিকিৎসকরা বলে থাকেন, এটি একটি নিরাপদ এবং স্মার্ট পদ্ধতি, কিন্তু একমাত্র তখনই যখন রোগীর সন্তানের জন্ম দেওয়া হয়ে গেছে। কারণ এই পদ্ধতির পর গর্ভধারণ ও বাচ্চার জন্ম সংক্রান্ত সমস্যা এবং প্রিম্যাচিওর ডেলিভারির সমস্যাও বেড়ে যায়। ফাইব্রয়েডে রক্ত সংবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ জরায়ুতেও রক্ত সংবহন বন্ধ হয়ে যাওয়া, ফলে সার্জারীর পর সুস্থ গর্ভধারণ সম্ভব নয় এবং তা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।

এমআরআই গাইডেড আল্ট্রাসাউন্ড: এই পদ্ধতিতে হাই ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড ওয়েভ, যা অতিরিক্ত উত্তাপের সৃষ্টি করে, তার মাধ্যমে ফাইব্রয়েডকে নির্মূল করা হয়। এমআরআই এর মাধ্যমে ফাইব্রয়েডের অবস্থানকে সঠিক ভাবে নির্ধারণ করা হয়, রেডিও ওয়েভ পাঠানোর জন্য।

রোগীকে সেডেটিভ দেওয়া হয় এবং এমআরআই মেশিন যাতে বিশেষ করে আল্ট্রাসাউন্ড এর ব্যবস্থা থাকে, তার ভেতর প্রবেশ করানো হয়। এই পদ্ধতিতে তিন ঘন্টা মতো সময় লাগে।
রেডিও ওয়েভের উত্তাপের মাধ্যমে ফাইব্রয়েডগুলো ধ্বংস করা হয় এবং এর জন্য দুটি বা তার বেশি সেসনের প্রয়োজন হয়।
যেসব মহিলাদের গর্ভধারণ ও সন্তানের জন্ম দেওয়া হয়ে গেছে তাদের জন্য এই পদ্ধতি উপযোগী।
ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ: হরমোনের স্টিমুলেশন ও পরিমান কমিয়ে দিয়ে ফাইব্রয়েডকে নির্মূল করা হয়।
স্টেরয়েড হরমোনের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলে ফাইব্রয়েড শুকিয়ে যায়। তবে চিকিৎসা বন্ধ হলে আবার সমস্যা দেখা দেয়। এই পদ্ধতিটি সেইসব মহিলাদের জন্য প্রয়োজনীয় যাদের ফাইব্রয়েডের আকার খুব ছোট ছোট অথবা যারা সার্জারীর আগে টিউমারের আকার ছোট করতে চায়। মায়োমেক্টমির আগে রোগীর অতিরিক্ত রক্তপাত বন্ধ করার জন্যও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। যদিও এই পদ্ধতিতে ফাইব্রয়েডের আকার ছোট হয়ে যায়, তবে এই পদ্ধতি ন’মাসের বেশি একটানা ব্যবহার করা উচিত নয় এবং এরপর আবার ফাইব্রয়েড ফিরে আসে। যেসব মহিলারা মেনোপজের খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন, তাদের জন্য খুব উপযোগী এই পদ্ধতি।

মেডিক্যাল মনিটরিং: ফাইব্রয়েডের আকার ও অবস্থান কে এবং রোগলক্ষন কে নজরে রাখতে হবে। ভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ড ও অ্যানিমিয়ার জন্য রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে এটি করা হয়। এটা সেইসব মহিলাদের জন্য প্রযোজ্য যাঁদের রোগলক্ষন খুব সামান্য এবং মেনোপজের কাছাকাছি বয়স চলে এসেছে।

জরায়ুর টিউমার-ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার থাকলে কি ধরনের খাবার খেতে হবে

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার হল জরায়ুর ভেতর গঠিত হওয়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এদের ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড, মায়োমাস এবং লিয়োমায়োমাস নামেও ডাকা হয়। ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার ক্যান্সারাস বা জীবন ঘাতক নয়, তবে এর ফলে শরীরে অনেক সমস্যা ও জটিলতা দেখা দেয়।

ফাইব্রয়েড জরায়ুর দেওয়ালের ভেতরে এবং জরায়ুর দেওয়ালের গায়ে গড়ে ওঠে। এগুলো মাসল ও অন্যান্য টিস্যু দিয়ে তৈরি হয়। এগুলো যেমন একটা বীজের আকৃতির মতো ছোট হতে পারে, তেমনি একটা টেনিস বলের সাইজের মতো বড় হতে পারে। রোগীর একাধিক বা একটিমাত্র ফাইব্রয়েড থাকতে পারে।

চিকিৎসকেরা ফাইব্রয়েড তৈরি হওয়ার সঠিক কারন জানেন না। ওভার ওয়েট বা ওবেসিটি ফাইব্রয়েড হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, তেমনি কিছু পুষ্টি উপাদানের অভাবের কারণেও ফাইব্রয়েড হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কতটা কমন এই ফাইব্রয়েডের সমস্যা
প্রায় ৮০% মহিলার জীবনে ফাইব্রয়েডের সমস্যা দেখা যায়। এই সমস্যাটা বংশগতির কারণেও হয়ে থাকে। কারোর মা বা বোনের যদি ফাইব্রয়েডের সমস্যা থাকে তাহলে সেই মহিলার ফাইব্রয়েডের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ফাইব্রয়েডের রোগলক্ষন ও সমস্যাগুলি হল—
যন্ত্রণা
মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত
কোষ্ঠকাঠিন্য
রক্তাল্পতা
গর্ভধারণে সমস্যা
গর্ভপাত
যদিও মাত্র ২০—৫০% মহিলারই ফাইব্রয়েডের রোগলক্ষন প্রকাশ পায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফাইব্রয়েডের চিকিৎসা প্রয়োজনই হয় না। রোগীকে চিকিৎসক অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন, দেখতে বলেন যে ফাইব্রয়েডের সমস্যা বাড়ছে কি না নাকি ফাইব্রয়েড নিজে থেকেই মিলিয়ে যাচ্ছে। যদিও খাদ্য ফাইব্রয়েড কে সারাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, কিন্তু প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস ও জীবন ধারণ পদ্ধতি ফাইব্রয়েডের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। খাদ্যাভ্যাস হরমোনের সমস্যা কে নিয়ন্ত্রন করে রাখতে পারে এবং হরমোনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখলে ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা যায়। কিছু নির্দিষ্ট খাদ্য ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে দূরে রাখতেও সাহায্য করে।

ফাইব্রয়েডের ঝুঁকি কমানোর জন্য ডায়েট ও জীবন ধারনের পরিবর্তন
খাদ্যাভ্যাস ও জীবন ধারনে বেশ কিছু পরিবর্তন আনলে ফাইব্রয়েডের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।

সবুজ এবং টাটকা খাদ্য
খাদ্যে প্রচুর পরিমানে কাঁচা এবং রান্না করা শাক সব্জি রাখতে হবে। এছাড়াও বিন্স জাতীয় খাদ্য এবং মাছ প্রচুর পরিমানে খাদ্যে রাখতে হবে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে এই ধরনের খাদ্য তালিকায় রাখলে ফাইব্রয়েডের সমস্যা বেশ কম থাকে এবং দেখা গেছে যে যাদের খাদ্যে রেড মিটের পরিমান বেশি তাদের মধ্যে ফাইব্রয়েডের সমস্যা বেশি।

অ্যালকোহল বন্ধ করা
যেকোনো ধরনের অ্যালকোহলই ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে বাড়িয়ে দেয়। যে ধরনের হরমোনের প্রভাবে ফাইব্রয়েডের জন্ম হয়, অ্যালকোহল সেই ধরনের হরমোনের পরিমান বাড়িয়ে দেয়। অ্যালকোহল ফাইব্রয়েডের প্রদাহকেও বাড়িয়ে দেয়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যেসব মহিলারা দিনে একটি থেকে তিনটি বিয়ার খেয়ে থাকেন তাদের ফাইব্রয়েডের সমস্যা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ৫০% বেশি। অ্যালকোহল কমিয়ে বা বন্ধ করে দিলে ফাইব্রয়েডের ঝুঁকিও কমে যায়।

ইস্ট্রোজেন কে ব্যালান্সড রাখা
মহিলা এবং পুরুষ উভয়ের মধ্যেই সুস্থ স্বাভাবিক ফার্টিলিটির জন্য ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রয়োজন হয়, কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন ফাইব্রয়েডের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয় বা তা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। ফাইব্রয়েডের সমস্যা সারানোর অনেক চিকিৎসাতেই ইস্ট্রোজেনের পরিমান কমানো হয়। এছাড়াও ইস্ট্রোজেন কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা যায় আরও যে যে পদ্ধতিতে, সেগুলো হল— ওজন কমানো — ফ্যাট সেল অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন তৈরি করে, ফলে ওবেসিটি বা শরীরের ওজন অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ফাইব্রয়েডের সমস্যাও বেড়ে যায়, তাই ওজন কমালে ফাইব্রয়েডের গ্রোথও কমে যায়। হরমোনের সমস্যা হতে পারে এমন কেমিক্যাল গ্রহণ না করা — প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম কেমিক্যাল এন্ডোক্রিন ব্যালান্সকে নস্ট করে দেয় ফলে ইস্ট্রোজেন হরমোনের পরিমান বেড়ে যায়। এই ধরনের কেমিক্যাল খাদ্য ও ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। যে যে বস্তুর কেমিক্যালের সংস্পর্শ এড়িয়ে যাওয়া উচিত তা হল— সার, কীটনাশক, রান্নার নন–স্টিক বাসন পত্র, রঙ, কলপের রঙ, বিভিন্ন পার্সোনাল কেয়ার প্রোডাক্ট।

ব্লাড প্রেশার কম রাখা
সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যেসব মহিলাদের ফাইব্রয়েডের সমস্যা আছে, তাদের হাউ ব্লাড প্রেশারের সমস্যাও আছে। যদিও এই ব্যাপারে এখনও অনেক সমীক্ষা করা বাকি আছে।
ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখা যদিও সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন। এই পদ্ধতিগুলি অবলম্বন করতে পারেন—
খাদ্যে অতিরিক্ত নুন খাওয়া বন্ধ করতে হবে। তার বদলে বিভিন্ন মশলা ও হার্বস এর মাধ্যমে খাদ্যকে সুস্বাদু করা যেতে পারে।
হাই সোডিয়াম প্রসেসড এবং প্যাকেট জাত খাবার খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
প্রতিদিন ব্লাড প্রেশার চেক করতে হবে
নিয়মিত এক্সারসাইজ করতে হবে
ওজন কমাতে হবে, বিশেষ করে কোমরের কাছের অতিরিক্ত মেদ কমাতে হবে
অ্যালকোহল বন্ধ করতে হবে
খাদ্যে পটাসিয়ামের পরিমান বাড়ানোর জন্য প্রতিবার খাদ্যে প্রচুর পরিমানে শাক সব্জি রাখতে হবে
ধূমপান বন্ধ করতে হবে এবং ধূমপায়ী ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে (প্যাসিভ স্মোকিং থেকে দূরে থাকতে হবে)
হাই ব্লাড প্রেশার থাকলে নিয়মিত চেক আপ এবং ওষুধ খাওয়া চালু রাখতে হবে।

যথেষ্ট পরিমানে ভিটামিন ডি গ্রহণ করতে হবে
ভিটামিন ডি প্রায় ৩২% পর্যন্ত ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে আমাদের শরীর নিজে থেকেই এই ভিটামিন তৈরি করতে পারে। ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট ছাড়াও আর যে যে খাবার শরীরে ভিটামিন ডি এর পরিমান বাড়াতে পারে, সেগুলো হল—
ডিমের কুসুম
দুধ, চীজ ও দুগ্ধজাত খাদ্য
ফর্টিফায়েড সিরিয়াল
সালমন ও টুনার মতো তৈলাক্ত মাছ
কড লিভার অয়েল

ধূমপান এবং ডায়েটের সম্পর্ক
উজ্জ্বল রঙিন ও সবুজ শাক সব্জি শরীরের সামগ্রিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন। লাল, হলুদ এবং কমলা রঙের সবজি শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমান বাড়ায়। গাঢ় সবুজ রঙের শাক সব্জিও শরীরের নানা রকমের পুষ্টির প্রয়োজন যোগায়। এই ধরনের খাদ্য শরীর কে ক্যান্সার সহ অন্যান্য রোগ থেকেও রক্ষা করে। যদিও একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে হলুদ ও কমলা রঙের খাদ্যে যে বিটা ক্যারোটিন পাওয়া যায়, তার সাথে ফাইব্রয়েডের উপশমের কোনো সম্পর্ক নেই। ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে বিটা ক্যারোটিন আরও বিপদ ডেকে আনে। একজন্য আরও সমীক্ষা করা প্রয়োজন। তবে ধূমপান বন্ধ শরীরের সামগ্রিক উন্নতি এবং ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে দূরে রাখতে সাহায্য করে।

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার থাকলে কি ধরনের খাবার খেতে হবে
খাদ্যাভ্যাস একা ফাইব্রয়েডের সমস্যা কে কমাতে পারে না। তবে ব্যালান্সড ডায়েট মেনটেন করলে ফাইব্রয়েডের রোগলক্ষনগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকে—

ফাইবার — ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য ওজন কমাতে এবং হরমোনের সমস্যা গুলি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ব্লাড সুগার লেভেল কেও নিয়ন্ত্রনে রাখে ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য। এইসব কারনে ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্য ফাইব্রয়েডের গ্রোথকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। যে খাদ্যগুলো খাওয়া যেতে পারে, সেগুলো হল — রান্না করা এবং কাঁচা শাক সব্জি, ফল, ওটস, মুসুর ডাল, বিন্স, বার্লি
পটাসিয়াম — পটাসিয়াম ব্লাড প্রেশার কে নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করে। প্রতিদিনকার খাদ্যে এইসব পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য যোগ করতে হবে — অ্যাভোক্যাডো, কলা, লেবু জাতীয় ফল, খেজুর, মুসুর ডাল, ওটস, আলু, টম্যাটো
দুগ্ধজাত খাদ্য — দই, ফুল ফ্যাট চীজ ইত্যাদি দুগ্ধজাত দ্রব্য খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। এই ধরনের খাদ্য ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং ম্যাগনেসিয়ামে সমৃদ্ধ। এই ধরনের খাদ্য ফাইব্রয়েডের গ্রোথকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
গ্রীন টি — গ্রীন টি তে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। ফাইব্রয়েডের বিভিন্ন রোগ লক্ষনগুলি কে নিয়ন্ত্রন করা যায় এর মাধ্যমে।

ফাইব্রয়েড থাকলে যেসব খাদ্য খাওয়া উচিত নয়
সুগার — মিস্টি জাতীয় খাদ্য এবং কার্বোহাইড্রেট ফাইব্রয়েডের রোগ লক্ষন কে অনেক গুনে বাড়িয়ে তোলে। এই ধরনের খাদ্য শরীরে ইনসুলিনের পরিমান বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত ইনসুলিন ওজনের বৃদ্ধি ঘটায় এবং এর ফলে ফাইব্রয়েডের সমস্যা বেড়ে যায়। রিফাইন্ড সুগার ও কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য যেমন – চিনি, গ্লুকোজ, মল্টোজ, কর্ন সিরাপ, সাদা রুটি, ভাত, পাস্তা, ময়দা, সোডা, সুগারি ড্রিংক, ফলের রিস, চিপস, প্যাকেজ এনার্জি বারস।
ইস্ট্রোজেন বেড়ে যায় এমন খাদ্য — কিছু খাদ্যে এমন কিছু প্রাকৃতিক উপাদান থাকে, যা শরীরে ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করে। এদের ফাইটো ইস্ট্রোজেন বলা হয়। এর মধ্যে কিছু খাবার আছে, যেগুলো কম পরিমানে খেলে শরীরের উপকার হয়, কিন্তু বেশি পরিমানে খেলে শরীরের ওপর খারাপ প্রভাব বিস্তার করে । এই ধরনের খাবারের পরিমান কমিয়ে দিতে হবে, যেমন — সয়বীন, সয়মিল্ক, টফু, ফ্ল্যাক্স সিড।
সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা শরীর কে সামগ্রিক ভাবে সুস্থ রাখে। যে সাবধানতাই নেওয়া হোক না কেন ফাইব্রয়েড হওয়া কে প্রতিরোধ করা যায় না তবে তার দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। শরীরে কোনো বদল হয়েছে মনে হলে তৎক্ষনাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আপনার যদি ফাইব্রয়েডের সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে চিকিৎসকই সব থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন যে কি চিকিৎসা করা হবে। সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়ন্ত্রিত জীবন ধারণ পদ্ধতি ফাইব্রয়েড সমস্যার সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ।

জরায়ুর টিউমার-জরায়ুর টিউমার বা ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড কি? কখন সার্জারীর প্রয়োজন?

ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার হল জরায়ুর ভেতর তৈরি হওয়া একপ্রকার টিউমারের ।যে হেতু এটি একটি টিউমার তাই সবার মনেই প্রশ্ন আসে- ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড কি ক্ষতিকর কোনও টিউমার? জরায়ুর টিউমার বা ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড কি ক্যান্সারাস? এর উত্তর হল – ‘না’ । যেহেতু এটা ক্যান্সারাস নয়, তাই রোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে তিনি সার্জারী করবেন না করবেন না। ফাইব্রয়েড যদি শরীরে কোনো সমস্যা তৈরি না করে, তাহলে সার্জারীর প্রয়োজন হয় না। যে যে ক্ষেত্রে সার্জারী করা যেতে পারে, সেগুলো হল—
মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত
দুটো মাসিকের মাঝে রক্তপাত হওয়া
তলপেটে চাপ ধরা এবং ব্যথা
বারবার মূত্রত্যাগের প্রয়োজন
মুত্রথলি খালি হতে সমস্যা হওয়া

সার্জারী তখনও প্রয়োজন হয় যখন রোগী ভবিষ্যতে সন্তান ধারন করতে চায়, কারন ফাইব্রয়েডের উপ্সথিতি অনেক সময় সন্তান ধারনে বাধা প্রদান করে, নানা কম্পলিকেশন তৈরি করে এবং মিসক্যারেজ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আপনি যদি সার্জারী করতে চান তাহলে আপনার কাছে দুই রকমের বিকল্প আছে—

মায়োমেকটমি
হিসটেরেকটমি
সার্জারী ফাইব্রয়েডের সমস্ত রোগলক্ষন কে সারিয়ে তোলে, কিন্তু এর অনেক বিপদও আছে। আপনার চিকিৎসক সার্জারীর অপশনগুলো নিয়ে আপনার সাথে কথা বলবেন এবং তখন আপনারা সিদ্ধান্ত নেবেন যে সার্জারীর প্রয়োজন আছে কিনা এবং তা কোন প্রকারের।

ফাইব্রয়েড সার্জারীর ধরন
ফাইব্রয়েড সার্জারীর দুধরনের পদ্ধতি আছে। কোনটা আপনার জন্য প্রয়োজন হবে তা নির্ভর করে—
ফাইব্রয়েডের আকারের ওপর
ফাইব্রয়েডের সংখ্যার ওপর
ইউটেরাসের কোথায় ফাইব্রয়েডের অবস্থান
আপনি ভবিষ্যতে সন্তান ধারন করতে চান কি না

মায়োমেকটমি
মায়োমেকটমি, ফাইব্রয়েড এবং তার অন্যান্য রোগ লক্ষন যেমন অতিরিক্ত রক্তপাত ইত্যাদিকে বন্ধ করে দেয়। এই সার্জারী তখন করা হয়, যখন রোগী ভবিষ্যতে সন্তান ধারন করতে চান বা অন্য কোনো কারনে তাঁর জরায়ুর প্রয়োজন হতে পারে এমন ক্ষেত্রে। ৮০% থেকে ৯০% মহিলাই মায়োমেকটমির মাধ্যমে রোগলক্ষন থেকে মুক্তি পায় বা তাদের রোগলক্ষন কমে যায়। বাদ দেওয়া ফাইব্রয়েডগুলো সার্জারীর পরে আর ফিরে আসে না, তবে আবার নতুন ফাইব্রয়েড তৈরি হতে পারে। এই সার্জারি করা ৩৩% মহিলার পাঁচ বছরের ভেতর আবার সার্জারী করার প্রয়োজন হয়েছে, কারন ইউটেরাসে তাদের নতুন ফাইব্রয়েডের জন্ম হয়েছে। এই সার্জারি তিনটি পদ্ধতির ভেতর যেকোনো একটি ভাবে করা হয়, এবং কোন পদ্ধতিতে হবে, তা নির্ভর করে ফাইব্রয়েডের সংখ্যা, আকার ও অবস্থানের ওপর। এই ক্ষেত্রে জেনারেল অ্যানাস্থেসিয়া করা হয়।

হিস্টেরেস্কোপি
যেসব মহিলাদের ফাইব্রয়েড ছোট এবং খুব অল্প পরিমানে থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এই সার্জারি খুব উপযোগী। এই সার্জারীর মাধ্যমে জরায়ুর ভেতর দিকে থাকা ফাইব্রয়েডকেও বাদ দেওয়া যায়।

এই পদ্ধতিতে চিকিৎসক রোগীর যোনিপথের মাধ্যম দিয়ে লম্বা, সরু এবং আলো আছে এরকম একটা টেলিস্কোপ প্রবেশ করাবেন এবং রোগীর জরায়ুতে ফ্লুইড ইঞ্জেক্ট করা হয় যাতে চিকিৎসক ফাইব্রয়েডগুলো ভালো ভাবে দেখতে পারেন। এরপর চিকিৎসক কোনো ডিভাইসের মাধ্যমে ওই ফাইব্রয়েডগুলো বাদ দিয়ে দেবেন এবং জরায়ুতে ইঞ্জেক্ট করা ফ্লুইডের মাধ্যমে ফাইব্রয়েডগুলো শরীরের বাইরে চলে আসে। এই সার্জারীতে রোগী সার্জারীর দিনই বাড়ি চলে যেতে পারেন।

অ্যাবডোমিনাল মায়োমেকটমি
এই পদ্ধতিটিকে ল্যাপারোটমিও বলা হয় এবং এটি বড় আকারের ফাইব্রয়েডের জন্য প্রযোজ্য। তবে এই সার্জারীতে অনেক বড় দাগ তৈরি হয়। চিকিৎসক রোগীর তলপেট কেটে ফাইব্রয়েড বের করেন। এই সার্জারীর পর এক থেকে তিন দিন পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে হয় এবং সম্পূর্ণ সুস্থতার জন্য দুই থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগে।

ল্যাপ্রোস্কোপি
যেসব মহিলাদের ছোট এবং কম পরিমানে ফাইব্রয়েড থাকে তাদের ক্ষেত্রে ল্যাপ্রোস্কোপি ব্যবহার করা হয়। ল্যাপ্রোস্কোপির সময় চিকিৎসক পেটের ওপর দুটো ছোট ছোট জায়গা কাটেন। কোনো একটা কাটার ভেতর দিয়ে চিকিৎসক একটা টেলিস্কোপ প্রবেশ করান যাতে তিনি রোগীর পেলভিস এবং জরায়ু কে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। অন্য কাটা অংশটার মাধ্যমে কিছু ডিভাইসের মাধ্যমে চিকিৎসক সেই ফাইব্রয়েডগুলো কেটে বার করেন। চিকিৎসক ফাইব্রয়েডগুলো কে অনেক ছোট টুকরো তে ভেঙে নেন। রোবোটিক ল্যাপ্রোস্কোপিতে চিকিৎসক রোবোটিক হ্যাণ্ডস ব্যবহার করেন এই সার্জারীর জন্য। ল্যাপ্রোস্কোপি সার্জারীতে একদিন হাসপাতালে থাকতে হতে পারে, তবে অ্যাবডোমিনাল মায়োমেকটমির থেকে অনেক দ্রুত সুস্থতা হয়।

হিসটেরেক্টমি
হিসটেরেক্টমিতে জরায়ুর কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ জরায়ু টাই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। রোগীর টিউমার যদি সংখ্যায় অনেক, আকারে বড় ফাইব্রয়েড থাকে এবং রোগীর যদি ভবিষ্যতে সন্তান ধারনের কোনো পরিকল্পনা না থাকে তাহলে এই সার্জারী করা হয়। সার্জেন কয়েকটি পদ্ধতিতে জরায়ু কে বাদ দিতে পারেনঃ ল্যাপারোটমি অথবা অ্যাবডোমিনাল হিসটেরেক্টমি সার্জেন সার্জারীর মাধ্যমে তলপেটে কেটে জরায়ু বাদ দিয়ে দেন।

ভ্যাজাইনাল হিসটেরেক্টমি
সার্জেন রোগীর যোনিপথের মাধ্যমে জরায়ু বাদ দেন, তবে অনেক বড় ফাইব্রয়েড এর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে কাজ হয় না।

ল্যাপরোস্কোপিক হিসটেরেক্টমি
এই পদ্ধতিতে সার্জেন কিছু ইনস্ট্রুমেন্টস প্রবেশ করিয়ে জরায়ুকে ছোট ছোট টুকরো তে কেটে বের করে আনেন। সার্জেন রোগীর ডিম্বাশয় এবং সার্ভিক্সকে অক্ষত রাখেন, ফলে রোগী আবার ফিমেল হরমোন তৈরি করতে পারেন। অ্যাবডোমিনাল হিসটেরেক্টমিতে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগে। ল্যাপরোস্কোপি হিসটেরেক্টমি এবং ভ্যাজাইনাল হিসটেরেক্টমিতে সুস্থতা অনেক দ্রুত আসে।

এন্ডোমেট্রিয়াল অ্যাবলেশান
এটি ঠিক সার্জারী নয়, এবং এতে ইউটেরাসের লাইনিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেসব মহিলাদের খুব ছোট আকৃতির ফাইব্র‍য়েড ইউটেরাসের একদম ভেতর দিকে থাকে তাদের ক্ষেত্রে এটা সবথেকে ভালো কাজ করে। অ্যাবলেশান ফাইব্রয়েড কে বাদ দেয় না, এর ফলে অতিরিক্ত রক্তপাত বন্ধ হয়। যেসব মহিলারা ভবিষ্যতে সন্তান ধারন করতে চান তাদের জন্য এই পদ্ধতি একেবারেই উপযুক্ত নয়। এইসময় চিকিৎসক রোগীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক অ্যানাস্থেশিয়া করা হয়। চিকিৎসক একটা বিশেষ ইন্সট্রুমেন্টের মাধ্যমে ইউটেরাইন লাইন একপ্রকার পুড়িয়ে দিয়ে কাজটা করেন। এর জন্য তিনি যে পদ্ধতিগুলি ব্যবহার কিরেন, তা হল—
ইলেক্ট্রিক কারেণ্ট
উত্তপ্ত ফ্লুইড ভর্তি একটি বেলুনের মতো পদার্থের সাহায্যে
হাই এনার্জি রেডিও ওয়েভ
মাইক্রোওয়েভ এনার্জি
উত্তপ্ত ফ্লুইড
এই পদ্ধতি যেদিন হচ্ছে রোগী সেদিনই বাড়ি চলে যেতে পারেন, তবে সম্পূর্ণ সুস্থতা নির্ভর করছে কোন প্রকারের অ্যাবলেশান করা হয়েছে তার ওপর। ফাইব্রয়েড এর ফলে হওয়া অতিরিক্ত রক্তপাত থেকে অ্যাবলেশান পদ্ধতিতে মুক্তি পাওয়া যায়।

উপকারিতা
ফাইব্রয়েড সার্জারী এবং অ্যাবলেশান এর মাধ্যমে ফাইব্রয়েড সংক্রান্ত রোগ লক্ষন যেমন অতিরিক্ত রক্তপাত এবং পেটের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ইউটেরাস বাদ দেওয়া ফাইব্রয়েড এর থেকে মুক্তি পাওয়ার স্থায়ী উপায়।

ঝুঁকি
এইসব পদ্ধতিগুলিই নিরাপদ, কিন্তু কিছু কিছু ঝুঁকি থেকে যায়। যেমন-
রক্তপাত
সংক্রমণ
আবার সার্জারীর প্রয়োজন
পেটের কাছাকাছি অবস্থিত অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ক্ষতি হওয়া
মলমূত্র ত্যাগে সমস্যা
জনন সংক্রান্ত সমস্যা
প্রেগন্যান্সিতে সমস্যা

সার্জারী এবং ফার্টিলিটি (জনন ক্ষমতা)
হিসটেরেক্টমি হলে আর সন্তান ধারন করা যায় না, কারণ এতে জরায়ু বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। মায়োমেক্টমি হলে সন্তান ধারন সম্ভব। অ্যাবলেশান হলে সাধারণত সন্তান ধারন সম্ভব নয়, তবে রোগীকে নিয়মিত জন্মনিরোধক গ্রহন কিরতে হবে, কারণ এই পদ্ধতিতে এন্ডোমেট্রিয়াল লাইনিং, অর্থাৎ যেখানে ডিম্বাণুটির ইমপ্লান্ট হয় সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই রোগী গর্ভবতী হলে গর্ভপাত ও অন্যান্য সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। রোগী যদি এমন কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন যে যাতে তিনি প্রেগন্যান্ট হতে পারবেন, তাহলে তাঁকে অন্তত তিনমাস বা তার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে, যাতে জরায়ু সম্পূর্ণ ভাবে সেরে উঠতে পারে।

অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি ওষুধের সাহায্যে
নন স্টেরয়ডাল অ্যান্টিইনফ্লামেটরি ড্রাগ যেমন আইবুপ্রুফেন এবং ন্যাপ্রক্সেন ব্যথা কমাতে সাহায্য করে
বার্থ কন্ট্রোল পিল এবং অন্যান্য বার্থ কন্ট্রোল পদ্ধতি অতিরিক্ত রক্তপাত বন্ধ করতে সাহায্য করে
অ্যান্টি হরমোনাল ড্রাগ যেমন প্রোজেস্টিন বা ডানাজোল ইস্ট্রোজেন কে ব্লক করে ফাইব্র‍য়েডের চিকিৎসায় সাহায্য করে।
গোনাডোট্রোপিন রিলিজং হরমোন অ্যাগোনিস্ট ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের উৎপাদন বন্ধ করে সাময়িক মেনোপজ তৈরি করে, ফলে ফাইব্রয়েডগুলো আকারে ছোট হয়ে যায়। চিকিৎসক এটা সার্জারীর আগে প্রেসক্রাইব করতে পারেন ফাইব্রয়েডের আকার ছোট করে সার্জারীতে সুবিধা করার জন্য। নন– ইনভেসিভ পদ্ধতি MRI গাইডেড ফোকাসড আল্ট্রা সাউণ্ড পদ্ধতিতে MRI স্ক্যানারের তাপের মাধ্যমে ত্বকের ওপর থেকেই ফাইব্রয়েডকে ধ্বংস করা হয়।
ইউটেরাইন আর্টারি এমবোলাইজেশনে ছোট ছোট কিছু টুকরো পদার্থ ধমনীর ভেতর ইঞ্জেক্ট করা হয়, ফলে ইউটেরাসে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয় এবং ফাইব্রয়েডগুলো আকারে ছোট হয়ে যায়। মায়োলাইসিসে উত্তাপ দিয়ে ইউটেরাসের রক্ত জালিকাকে ও ফাইব্রয়েড কে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। ক্রায়োমায়োলাইসিসে একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, কেবল ফাইব্রয়েডগুলি কে জমিয়ে দেওয়া হয়। চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করুন, উনিই সঠিক ভাবে বলতে পারবেন, কোন পদ্ধতি আপনার জন্য উপযুক্ত। সমস্ত পদ্ধতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভাবে জেনে নিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।

জরায়ুর টিউমার-জরায়ুর টিউমার বা ফাইব্রয়েডের ব্যথাকে চেনা এবং তার ঘারোয়া চিকিৎসা
ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার হল একপ্রকারের নন ক্যান্সারাস টিউমার যা ইউটেরাস বা জরায়ুর দেওয়ালে গড়ে ওঠে। অধিকাংশ মহিলারই জীবনে কোনো না কোনো সময়ে ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড হয়ে থাকে, কিন্তু যতক্ষণ না কোনো বিশেষ রোগলক্ষন প্রকাশ না পায়, তারা তা বুঝতে পারে না। কিছু মহিলার ক্ষেত্রে এই ফাইব্রয়েডের যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে প্রলম্বিত মাসিক এবং তা থেকে অতিরিক্ত রক্তপাতের সাথে সাথে ফাইব্রয়েডের কারনে আর যা যা সমস্যা হয়ে থাকে তা হল—
পেলভিক অঞ্চলে চাপ এবং ক্রনিক ব্যথা
পিঠের নীচের দিকে ব্যথা
পেটে ব্যথা এবং পেট ফুলে থাকা (ব্লোটিং)
মাসিক এবং যৌন সংসর্গের সময় যন্ত্রণা
এই ফাইব্রয়েড এর ফলে রোগীর মনে হয় যে তার বারবার মূত্রত্যাগের প্রয়োজন। ব্যথা মাঝেমাঝে চলে যায় আবার ফিরে আসে, অথবা শুধুমাত্র মাসিক বা যৌন সংসর্গের সময় হয়ে থাকে। যন্ত্রণাটা তীক্ষ্ণ বা চাপা ধরনের হয়ে থাকে। ফাইব্রয়েডেস এর আকার, পরিমান এবং অবস্থানের ওপর নির্ভর করে রোগলক্ষনের নানা পরিবর্তন হয়ে থাকে। অন্যান্য পেলভিক ডিসঅর্ডার যেমন — এন্ডোমেট্রিওসিস, অ্যাডিনোমায়োসিস, পেলভিক ইনফেকশন ইত্যাদির সাথে ফাইব্রয়েড এর রোগলক্ষনের প্রচুর মিল দেখতে পাওয়া যায়। যদি আপনার পেলভিক অঞ্চলের যন্ত্রণা দীর্ঘস্থায়ী হয়, প্রলম্বিত মাসিকের সাথে অতিরিক্ত রক্তপাত এবং মূত্রত্যাগের সময় সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

বাড়িতে কিভাবে ফাইব্রয়েডের ব্যথার উপশম করা যায়?
ঘরোয়া পদ্ধতিতে এবং ওভার দ্য কাউন্টার মেডিসিন অর্থাৎ খুব সহজেই দোকানে কিনতে পাওয়া যায় এরকম ওষুধের মাধ্যমে রোগলক্ষন কে নিয়ন্ত্রন করা যায়। এটা তখনই সম্ভব যখন রোগলক্ষন খুবই সামান্য এবং ত দৈনন্দিন জীবন যাত্রাকে ব্যাহত করে না।

ঘরোয়া পদ্ধতিগুলি হল—
ননস্টেরয়েড অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ, যেমন আইবুপ্রুফেন খাওয়া
হিটিং প্যাড বা গরম সেঁক দেওয়া
আরও কিছুকিছু ঘরোয়া পদ্ধতি আছে যার সাহায্যে রোগলক্ষনকে প্রশমিত করা যায়— স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। খাবারের ভেতর প্রচুর ফল, সবজি, দানা শস্য, লিন মিট খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে এবং রেড মীট, কার্বোহাইড্রেট এবং রিফাইন্ড সুগার জাতীয় খাদ্যকে বাদ দিতে হবে যেগুলো ফাইব্রয়েড এর অবস্থা কে আরো খারাপ করে তোলে। দুধ ও দুধ জাতীয় খাদ্য যেমন দই, চীজ ইত্যাদি সপ্তাহে একদিন করে খেতে হবে। অ্যালকোহলের পরিমান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে
আয়রন এবং ভিটামিন বি এর সাথে সাথে অন্যান্য ভিটামিন এবং মিনারেলস খেতে হবে যাতে অতিরিক্ত রক্তপাতের কারনে রক্তাল্পতা না হয়। নিয়মিত এক্সারসাইজ করতে হবে এবং নিজের শরীরের ওজন সঠিক রাখতে হবে সোডিয়ামের পরিমান নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে যাতে ব্লাড প্রেশার বেড়ে না যায় যোগা বা মেডিটেশন করে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

আকুপাংচার এর মাধ্যমে কি ফাইব্রয়েডের চিকিৎসা করা সম্ভব?
আকুপাংচার ফাইব্রয়েডের যন্ত্রণা কে নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করে। আকুপাংচার একটি প্রাচীন চৈনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। এর মাধ্যমে ত্বকের ওপর নানা জায়গায় খুব সরু সূঁচের মাধ্যমে সমগ্র শরীরের নানা অংশ কে ইনফ্লুয়েন্স করা যায়। কারেন্ট রিসার্চে দেখা গেছে যে আকুপাংচারের মাধ্যমে অনিয়মিত রক্তপাত এবং মাসিকের যন্ত্রনা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। যদিও এই রিসার্চ করার সময় কিছু টেকনিক্যাল ভুল ছিলো।

ফাইব্রয়েডের ব্যথার প্রথাগত চিকিৎসা পদ্ধতি
অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাসিকের জন্য দায়ী যে হরমোন, ওষুধের মাধ্যমে তার চিকিৎসা করা সম্ভব। সেগুলি হল—
ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ
প্রোজেস্টিন রিলিজিং ইন্ট্রা ইউটেরাইন ডিভাইসেস
গোনাডোট্রোপিন রিলিসিং অ্যাগোনিস্টস
গোনাডোট্রপিন রিলিসিং অ্যান্টাগোনিস্ট
এই ওষুধগুলো রোগলক্ষনের সাময়িক নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, তবে এতে ফাইব্র‍য়েড সেরে যায়না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর একমাত্র চিকিৎসা হল সার্জারি (মায়োমেকটমি) এবং নন সার্জিক্যাল মেথড যাকে ইউটেরাইন আর্টারি এমবোলাইজেশন বলা হয়। এমবোলাইজেশনের মাধ্যমে ফাইব্রয়েড এর অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এর ফলে ফাইব্রয়েড এর আকার ছোট হয়ে যায়। অন্যান্য নন সার্জিক্যাল পদ্ধতিগুলি হল মায়োলাইসিস এবং ক্রায়োমায়োলাইসিস। মায়োলাইসিস পদ্ধতি যেমন এতে ইলেকট্রিক কারেন্ট বা লেসার এর মতো হিট সোর্স ব্যবহার করে ফাইব্র‍য়েড এর আকার কে ছোট করে দেওয়া হয়। ক্রায়োমায়োলাইসিসের মাধ্যমে ফাইব্রয়েডস কে ফ্রোজেন করে দেওয়া হয়। সার্জারির মাধ্যমে জরায়ু সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া, যাকে হিসটেরেক্টমি বলা হয়, সেটাই ফাইব্রয়েডের যন্ত্রণা কমানোর একমাত্র স্থায়ী উপায়। হিসটেরেক্টমি একটি অনেক বড় অপারেশন এবং এর ফলে রোগীর আর ভবিষ্যতে সন্তান ধারনের ক্ষমতা থাকে না, তাই যখন অন্য আর কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিতে কাজ হয় না, তখনই এই সার্জারি করা প্রয়োজন।

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার হলে কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে?
পেলভিক অঞ্চলের যেকোনো যন্ত্রণা, তা সে যতই সামান্য হোক না কেন চিকিৎসক বা গায়নোকোলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়াও যে যে বিষয়গুলোর জন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, সেগুলো হল—
স্বাভাবিকের অতিরিক্ত বেশি সময় ধরে মাসিক চললে এবং অতিরিক্ত রক্তপাত হলে
দুটো মাসিকের মাঝে আবার সামান্য রক্তপাত হলে
পেলভিক অঞ্চলের যন্ত্রণা যা সহজে যাচ্ছে না বা বারবার ফিরে আসছে এমন যন্ত্রনা
মূত্রত্যাগের সময় সমস্যা
বারবার মূত্রত্যাগের প্রবনতা এবং তার জন্য রাতে বারংবার ঘুম ভেঙে যাওয়া।

জরায়ুর টিউমার বা ফাইব্রয়েডের যন্ত্রণা থেকে কতদিনে মুক্তি পাওয়া যাবে?
ফাইব্রয়েডের যন্ত্রণা মেনোপজের পরে কমে যায়, তবে পুরোপুরি সেরে যায় না। যদি রোগী ফাইব্রয়েডের থেকে মুক্তির জন্য সার্জারী করেন, তো তার পরেই এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তবে এই ফাইব্রয়েড আবার ফিরে আসতে পারে রোগীর বয়েসের ওপর নির্ভর করে। রোগী যদি তার মেনোপজের কাছাকাছি সময়ে চলে আসে, তাহলে সমস্যা বারবার ফিরে আসার সম্ভাবনা কমে যায়। কিছুক্ষেত্রে ফাইব্রয়েড রিমুভ করার সময় জরায়ু বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং তার ফলে সন্তান ধারনের সমস্যা দেখা দেয়। ফাইব্রয়েডের সমস্যার একমাত্র পারমানেন্ট সমাধান হল হিসটেরেক্টমি, কারণ তাতে সম্পূর্ণ ইউটেরাসটাই বাদ দেওয়া হয়, তবে এটি অনেক বড় অপারেশন হওয়ার কারনে এর পরে সুস্থ হতেও অনেক সময় লেগে যায়। সবশেষে বলা যায় পেলভিক অঞ্চলের যেকোনো যন্ত্রণা, তা বেশ কিছুদিন স্থায়ী হলেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। ফাইব্রয়েডের রোগলক্ষন এক এক জনের ক্ষেত্রে এক এক রকম হয়ে থাকে এবং তা বয়স, ফাইব্রয়েডের সংখ্যা এবং আকারের ওপর নির্ভর করে। ফাইব্রয়েডের যন্ত্রণার নানারকম চিকিৎসা আছে। একদম প্রথমেই ডায়েট এবং লাইফস্টাইল চেঞ্জ করতে হবে, তবে কিছুক্ষেত্রে হিসটেরেক্টমি একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়। ফাইব্রয়েডের যন্ত্রণা কারোর কারোর ক্ষেত্রে প্রচণ্ড বেশি হয়ে থাকে, তবে এটা কখনই ক্যান্সারাস নয়, এর সাথে প্রেগন্যান্সির কোনো সম্পর্ক নেই এবং সাধারণ ভাবে মেনোপজের পরে ফাইব্রয়েড ছোট হয়ে যায়।

জরায়ুর টিউমার-ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার কেন হয়? লক্ষণ ও চিকিৎসা
সাধারন ভাষায় ফাইব্রয়েড হল জরায়ুর টিউমার, যা প্রধানত মহিলাদের ইউটেরাস বা জরায়ুতে তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে জরায়ুর বাইরের ও ভিতর প্রাচীর বরাবর ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো আকারে কখনো ছোট বা বড় হয়ে থাকে এবং এর থেকে তলপেটে ব্যাথা বা স্বাভাবিকের থেকে বেশি ঋতুস্রাবের সম্ভাবনা থাকে। অনেকসময় ইউটেরাসে ফাইব্রয়েড থাকলেও তার কোনো যথাযথ লক্ষণ দেখা যায়না অর্থাৎ শরীরে কোনোপ্রকার ব্যাথা বা অস্বস্তি হতে দেখা যায়না। তবে অনেকসময় এর উপসর্গগুলি এতটাই অস্বাভাবিক হয়ে থাকে যা সঠিক চিকিৎসা না করলে পরবর্তীকালে তা থেকে গর্ভধারণে অসুবিধা, ওজনবৃদ্ধি ইত্যাদি সমস্যাগুলি হতে পারে। যদিও ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার কেন হয় বা এর উৎস কি তা নিয়ে এখনো কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমারের এর প্রকারভেদ
১) ইন্ট্রামিউরাল ফাইব্রয়েড: এই ধরনের টিউমার মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমানে দেখা হয়। এটি জরায়ুর ভিতরের প্রাচীরে দেখা যায় এবং এর আকার বেশ বড় হয়। অনেক সময় এর আকার এতটাই বৃদ্ধি পায় যে পেটের একাংশে ফোলা ভাব স্পষ্টতই লক্ষ্য করা যায়।

২) সাবসেরাস ফাইব্রয়েড : জরায়ুর বহিঃপ্রাচীরে হয়, যাকে “সেরোসা” বলা হয়ে থাকে। এটি আকারে বৃদ্ধি পেলে জরায়ুর আকার বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৩) সাবমিউকাস ফাইব্রয়েড : জরায়ুর মধ্য কোশপ্রাচীরে হয়ে থাকে, এই ধরনের ফাইব্রয়েড খুব কম সংখ্যক মহিলাদের মধ্যেই দেখা যায়।

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার কেন হয় ?
ফাইব্রয়েড ইউটেরাস বা ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার কেন হয় তা বলা মুশকিল তবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি জরায়ুর টিউমার গঠনে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলে অনুমান করা হয়।

জরায়ু থেকে প্রধান দুটি হরমোন যথা ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন ক্ষরিত হয়, এই হরমোনগুলি যেমন প্রতিমাসে নিয়মিত পিরিয়ড সৃষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তেমনি ফাইব্রয়েড সৃষ্টির ক্ষেত্রেও বিশেষ ভাবে দায়ী করা হয়।
ফাইব্রয়েড অনেকসময় বংশগত হয়ে থাকে অর্থাৎ পরিবারে আগে যদি কারোর থেকে থাকে তবে হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
প্রেগনেন্সির কারনে শরীরে ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তাই এই সময়ে ফাইব্রয়েড সৃষ্টি হতে পারে এবং বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফাইব্রয়েড এর ঝুঁকি কি কি হতে পারে। এছাড়াও বিশেষ কিছু ফ্যাক্টর থাকলে মহিলাদের মধ্যে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। গর্ভবতী মহিলাদের ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া ৩০ বছর বয়সে বা তার পরে ফাইব্রয়েড হতে দেখা যায়, এবং অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির ফলেও এটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফাইব্রয়েড যদি পরিবারের কারোর অর্থাৎ মা, ঠাকুমা বা দিদি –র মধ্যে হয়ে থাকে তাহলে পুনরায় এই রোগটি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

ফাইব্রয়েড বা জরায়ুর টিউমার এর লক্ষণ কি কি হতে পারে?
ফাইব্রয়েড এর লক্ষণ মূলত নির্ভর করে টিউমারের সংখ্যা এবং আকারের উপর, যেমন সাবমিউকোসাল ফাইব্রয়েড এর ফলে ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হতে দেখা যায় এবং যার থেকে এবং গর্ভধারনে সমস্যা দেখা যায়। যদি টিউমারের আকার ছোটো থাকে বা কেউ মেনপজে পৌঁছে গিয়ে থাকেন তাহলে সাধারণত ফাইব্রয়েড এর লক্ষণ অনুভব করা যায় না। ফাইব্রয়েড অনেকক্ষেত্রে মেনপজে এসে বা তার পরে ধীরে ধীরে নিজে থেকেই কমে যায়। কারণ হিসেবে বলা যায়, মেনপজে প্রধান দুটি স্ত্রীজনিত হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন এর মাত্রা কমে আসে ফলে তা ফাইব্রয়েড এর বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারেনা। সংক্ষেপে লক্ষণগুলি উল্লেখিত করা হল-
ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত এবং অনেকসময় তাতে জমাট বাধা রক্ত থাকে।
তলপেট বা কোমরে ব্যাথা
ঋতুস্রাব বা পিরিয়ডের সময় পেট ব্যাথা বা খিঁচুনি
যৌনমিলনের সময় ব্যাথা বা অস্বস্তি
অনেকক্ষেত্রে পিরিয়ড স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশিদিন ধরে চলতে থাকে
পেটের নিচের দিকে ব্যাথা বা চাপ সৃষ্টি হয়

ফাইব্রয়েডর চিকিৎসা কিভাবে করা যেতে পারে?
ফাইব্রয়েড এর লক্ষণ অনেকসময় বোঝা যায় আবার অনেকসময় অনুভুত হয়না। তবে উপোরক্ত লক্ষণগুলি যদি দেখা যায় তবে তৎক্ষণাৎ একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যদি ডাক্তার কিছু অস্বাভাবিক বুঝে থাকেন তবে ইউ.এস.জি এবং পেলভিক এম.আর.আই করার পরামর্শ দিতে পারেন।

ওষুধ দিয়ে
চিকিৎসা হিসেবে বেশ কিছু হরমোন জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয় যা মূলত যথা ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা কে নিয়ন্ত্রন করে টিউমারে আকারকে সঙ্কুচিত করে রাখে। ব্যাথা কমাতে anti-inflammatory pain relievers, যেমন Ibuprofen এর মতন ট্যবলেট দেওয়া হয়। অনেক সময় জন্ম নিয়ন্ত্রক পিল বা বড়ির ব্যাবহার ও করা হয়।

সার্জারি
জরায়ুর টিউমারের প্রাথমিক স্তরে সার্জারির বিশেষ কোনো প্রয়োজন হয় না, তবে কিছুক্ষেত্রে যদি ফাইব্রয়েডের আকার এবং পরিমান বৃদ্ধি পায় তাহলে সার্জারি সাহায্য নেওয়া হয় , যাকে ডাক্তারি ভাষায় মায়োমেকটমি (myomectomy) বলা হয়ে থাকে। অ্যাবডোমিনাল মায়োমেকটমির ক্ষেত্রে তলপেট চিরে জরায়ুর থেকে ফাইব্রয়েডগুলিকে বা টিউমারকে কেটে আলাদা করা হয়, যদিও এই একই জিনিস লেপারোসকপির মাধ্যমেও করা হয়ে থাকে অর্থাৎ বড়ো আকারে পেট না চিরেও ছোট ছিদ্রের মাধ্যমেও টিউমারটি কেটে বাদ দিয়ে বাইরে বের করে আনা হয়।

জরায়ুর টিউমার হলে কি কি বিষয় মাথায় রাখা জরুরী?
সধারনত ফাইব্রয়েড যদি প্রাথমিক স্তরে থাকে তাহলে চিন্তার কোন কারণ থাকে না, তবে ধীরে-ধীরে এর আকার বাড়তে থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। গর্ভবতী মহিলাদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিৎ, কারন এই সময়ে মহিলাদের বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যারা গর্ভধারণ করতে ইচ্ছুক তাদের আগে থেকে ডাক্তারের সাথে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে নেওয়া একান্ত আবশ্যিক।

সংগ্রহঃ হেলথ ইনসাইড

Media PlantAuthor posts

Avatar for Media Plant

Shopping and Entertainment Media Plant organized.

Comments are disabled.